Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

Responsive Advertisement

তমলুক ও পান্ডুয়া ভ্রমণের খুঁটিনাটি জেনে নিন

তমলুকের বর্ণভীমা মন্দির:



ইতিহাসের তাম্রলিপ্তই বর্তমান তমলুক। মহাকব্য মহাভারতে পাওয়া যায় তাম্রলিপ্তের নাম। দ্রৌপদির সয়ম্ভর সভায় উপস্থিত ছিলেন তাম্রলিপ্ত রাজ তাম্রধ্বজ। তিনি তাঁর বিশাল হস্তি বাহিনী নিয়ে পান্ডবদের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করেছিলেন। 

তমলুকের প্রাচীন এবং জাগ্রত সতীপীঠ দেখতে আসুন এই তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরে। আসুন তমলুক স্টেশনে। স্টেশনটাও দেখে নিন, খুব সুন্দর লাগবে দেখতে। ফুটব্রিজগুলো যেন শিল্পীর ক্যানাভাস।রং-তুলির ছোঁয়ায় আকাশছোঁয়া সিঁড়ি। পীঠস্থানে সতীর বা পায়ের গোড়ালি পড়েছিল বলে বিশ্বাস। "অন্নদামঙ্গল" কাব্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত এই তীর্থের প্রাচীন নাম 'বিভাস তীথা'। মায়ের নাম ভীম রূপা বা কপালিনী এবং ভৈরব শ্রী সর্বানন্দ কপালী।

ওড়িশিশৈলিতে গড়া মাকড়া পাথরে নির্মিত মন্দিরের গর্ভগৃহে কৃষ্ণবর্ণা, চতুর্ভূজা দেবী অধিষ্ঠিত। দেবী এখানে উগ্র তারা হিসাবে পূজিত। গর্ভগৃহের সামনে জগমোহন। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ। মন্দিরের গঠন বৌদ্ধ মঠের মত। 

নাট মন্দিরের পাশের একটা বৃদ্ধ বট গাছের  গায়ে ঝুলছে অসংখ্য মানতের রং বেরংঙের সুতো।ঠিক পাশেই আছে পবিত্র এক কুন্ড। সিঁড়ি দিয়ে নামলে তব মিলবে  জল। তবে এখানে জড়িয়ে আছে প্রাচীন লোককথা। রাজার বাড়ীতে এক ধীবর পত্নী রোজ নিজের হাতে ধরা শোল মাছ দিয়ে যেত। এই কুন্ডে মরা মাছ স্নান করালেই সেই মাছ জ্যান্ত হয়ে যেত। মহারাজ এই কুন্ডর খবর শুনে সেখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

মন্দিরের পাশেই পাওয়া যাবে  ভাতের হোটেল। এখানে খাওয়া  - দাওয়া সেরে ফিরা যায়।।

অতিতের বাংলার রাজধানী হয়েছিল পান্ডুয়া। মুসলিম শাসকদের অনেক কীর্তির নানান স্থাপত‍্যের ধ্বংসাবশেষ আজও অতিতকে মনে করায়। পর্যটন মূল‍্যের পাশাপাশি ঐতিহাসক মুল‍্য কিন্তু অপরিসীম। 

অতিতে  এই এলাকার নাম ছিল পান্ডুনগর। এখানকার প্রথম দর্শনীয় স্থানের  নাম -বড়ী দরগাহ। ১৪৫৮  সালে দরগাটি গঠন করেন সুলতান শমসুদ্দিন ইউসুফ শাহ। দরগার মাথার উপর তিনটি গম্বুজ। ১৩৪২ এ তৈরী সুলতান আলাউদ্দিনের  মহান কীর্তি সালিম দরওয়াজা। ২২ফুট দীর্ঘ ৭ফুট ৮ ইঞ্চি প্রশস্ত সালিম দরওয়াজা অর্থাৎ পান্ডুয়ার প্রবেশদ্বার আজও পর্যটকদের স্বাগত জানায়। এছাড়াও পান্ডুয়ায় অন‍্যান‍্য দ্রষ্টব‍্যগুলি -ছোট দরগাহ, একলাখি মসজিদ, কুতুবশাহি মসজিদ,আদিনা মসজিদ, সাতাশ ঘরা ইত‍্যাদি।। বাড়ির পাশে পান্ডুয়া আসুন ঘুরতে ও দেখতে। 


কী ভাবে পৌঁছাবেন :-- 

শিয়ালদহ থেকে গৌড় এক্সপ্রেসে মালদহ টাউন। স্টেশনের বাইরে থেকে অটোয় পান্ডুয়া চলে  আসুন।পান্ডুয়া পশ্চিমবঙ্গে দুটি ১টি মালদহ জেলায় আর একটি হুগলিতে। মালদহের পান্ডুয়াকে বলা হত বড় পেঁড়া আর হুগলির পান্ডুয়াকে ছোট্ট পেঁড়ো। ইতিহাসে  কি লিখছে একটু জেনে নিই।

খৃস্টিয় চতুর্থ শতকে গুপ্তযুগে রাঢ়দেশের রাজা ছিল চন্দ্রবর্মা বা চন্দ্রকেতু। প্রথমে তার দূর্গ ছিল শুশুনিয়া পাহাড়ে এবং পুষ্করণা বা পোখরানা ছিল রাজধানী। পরবর্তী কালে  তিনি মহানাদে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। আজও মহানাদে ভাঙাপ্রসাদ ও চন্দ্রদিঘী রয়েছে। পান্ডুয়া শহরের পশ্চিম দিকে ইলামপুর নামক স্থানে বালিখাদ থেকে গুপ্ত যুগের জলের পাত্র, লোহার কোদাল, খুন্তা, জলের পাত্র প্রত্নতত্ববিদগণ অনুসন্ধান চালাবার সময় পেয়ে যান। এছাড়া বালিখাদ থেকে প্রাচীন নৌকার কাঠ পাওয়া যায়। এর থেকে প্রমাণ হয় যে, দামোদরের শাখা নদীর তীরে মানুষের বসতি বিস্তার করেছিল।

অনুসন্ধানে কয়েকটি মৃত পাত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণ করা আছে। চন্দ্রপুর চন্দ্রকেতু রাজার স্মৃতি বিজড়িত স্থা ন। অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত শিবলিঙ্গ আজও পূজিত হয়। পালযুগে মহারাজ  দেব পালের রাজত্ব কালে  (৮১৯-৮৫০) খ্রিস্টাব্দে পান্ডুয়ার দামোদরের শাখা নদীটির তীরে ইট ও পাথরের একটি মন্দির ছিল। মন্দিরটির কীর্তিমুখও ঘন্টা চিহ্নিত পাথরের থামের উপর নির্মিত । এই মন্দিরে বিষ্ণু, শিব নানা দেব-দেবীর পূজ হত। পালযুগে পান্ডুয়ার নাম ছিল 'প্রদ্মণ নগর'। পান্ডুয়া থেকে একটা বিষ্ণুমুর্তি এবং সিমলাগড় থেকে একটা সূর্য্যমুর্তি নয়া দিল্লির সংগ্রহশালায় রাখা আছে।

সেন বংশীয় বল্লাল সেনের রাজত্বকালে 'প্রদ্মণনগর' খুবই জমজমাট ছিল। সেই সময় কিছু মন্দির তৈরী হয়। সেইসব মন্দিরে শিব ও বিষ্ণুর মূর্তির পূজো হত। ১৮৫৩ খৃিষ্টাব্দে হাওড়া থেকে পান্ডুয়া অবধী প্রথম রেলপথ স্থাপন হয়। ১লা সেপ্টেম্বর প্রথম পান্ডুয়া পযর্ন্ত রেল চলাচল শুরু হয়। বিলেতের ফেরারি ক্যুইন ইন্জিন দিয়ে রেলের পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে লিলুয়ায় ফেরারী ক্যুইন ইঞ্জিনটি রাখা আছে।

কী দেখতে পান্ডুয়া যাবেন-  শুলতান শাহ্ সুফিউদ্দিনের নির্মিত মিনারটি তাঁর অমর কীর্তি। বলা যায় এই মিনারটি তাঁর বিজয় স্তম্ভ। মিনারটির সাথে দিল্লির কুতুবমিনারের সাদৃশ্য আছে। মিনিরটির উচ্চতা ১৩৬ ফুট ছিল। ভৃমিকম্পের ফলে এখন ১২৫ ফুটে নেমে আসে। মিনারটির পাঁচটি তলা আছে। ১৬১ টি সিঁড়ি বিদ্যমান। সম্পূর্ণ ইট দ্বারা নির্মিত। বর্তমান ভারত সরকারের প্রত্ন বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত।

বাইশদুয়ারি মসজিদঃ

বাইশদুয়ারি মসজিদটি সুলতান শাহ সুফিউদ্দিনের দ্বিতীয় কীর্তি। মসজিদটির বাইশটি গম্বুজ ও বাইশটি প্রবেশদ্বার ছিল। দ্বারের ফলকগুলিতে আছে গণেশ মূর্তি আর দেব-দেবীর মূর্তি দেখা যায়। এই মসজিদটি বর্তমান ভারত সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত আছে।

কোড়ে মসজিদ:

সুলতান শাহ্ সুফি প্রাসাদ সংলগ্ন একটি মসজিদ তৈরী করেছিলেন এইটি কোড়ে মসজিদ। 

ইদগাহ : 

পান্ডুয়ার পশ্চিম অংশে একটি ইদগাহ বিদ্যমান। এখানে ঈদের সময় হাজার হাজার মুসলিমগণ নমাজ পড়তেন। পরে এই স্থানের নামকরণ হয় নামাজগ্রাম । এখানেঈ সুফি সক্কার পবিত্র সমাধী আছে। 

আউলিয়া গুম্ফা সাহেব;

শাহ সুফিউদ্দিনের সাথেই আউলিয়া গুম্ফা সাহেব ও তার সাথে ১১ জন শিষ্য ছিল। শাহ সুফিউদ্দিন ইসলাম ধর্ম প্রচারে উদ্দেশ্যও ছিল। মিনারের অদূরে বারো জন আউলিয়ার সমাধিক্ষেত্র রয়েছে।

পান্ডুয়া মেলা :

১লা মাঘ সুলতান শাহ সুফিউদ্দিনের বিজয়ের দিন। সেই আমল থেকেই প্রতি বছর মিনারের  সামনের মাঠে বিশালাকায় মেলা বসে। মেলা এক মাস ধরে চলে। মেলায় সার্কাস, ম্যাজিক, নাগোরদোলা এবং বহুবিধ জিনিসপত্রের দোকান জমাট হয়ে ওঠে। মেলায় ২ রা ও ৩ রা মাঘ আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ। তারা ধামসা-মাদোলে মেলাকে মুখরিত করে তোলে। বস্তুত এই মেলা সম্প্রীতির মেলা নামে পরিচিত।

দেউল ও মন্দির;

পাশেই বৈঁচি গ্রমে একটি দেউল ও দোলমঞ্চ বিদ্যমান। ২০ টি শিব মন্দির দেখার মত। দোলমঞ্চটিতে টেরাকোটর আপূর্ব কাজ  দেখার মত। এই ধরনের দোলমঞ্চ হুগলি জেলায় বিরল।

ক্ষীর খুন্তি ও  নতুন চন্দ্রহাটি;

কয়েকটি মন্দির খুবই উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি মন্দিরে সামনে টেরাকোটা কাজ দিয়ে সাজানো। টেরাকোটাগুলিতে ফুল, রামায়ণ, মহাভারত, শিকারের দৃশ্য, প্রমোদ ভ্রমণ, যুদ্ধযাত্রা দৃশ্য দেখা যায়। চন্দ্রহাটিতে দুটি শিব মন্দির আছে। 

বোড়াগাড়ি:

খ্রিস্টিয় অষ্টাদশ শতকের দুইটি পঞ্চরত্ন মন্দির আছে। এই খানে ১৬০১ শকাব্দে প্রতিষ্ঠিত 'গোপাল জিউর' মন্দির খুবই প্রসিদ্ধ।

পোটবা

পোটবা একটি প্রচীন জনপদ। রাজা গোপাল কিশোর রায়চৌধুরির র্কীতি দুটি দিঘী - "যমুনা দিঘী" ও 'গোপাল দিঘী'। এছাড়া  দেখা যাবে প্রাচীন দূটি শিব মন্দির। মন্দিরটিতে টেরাকোটার কাজ সমৃদ্ধ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ